বিশ্বনাথ উপজেলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচিতি

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৩, ২০১৬ ৭:৪৯ অপরাহ্ণ

(ক) আর্থ-সামাজিক পরিচিতিঃ সিলেটের আর্থ সামাজিক অবস্থা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। দীর্ঘদিন আসাম প্রদেশের সাথে সংযুক্ত থাকার ফলে এখানে যে সামাজিক রীতি-নীতি ও আচার-আচরণ গড়ে উঠেছে তা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা। এখানকার পাহাড়-পর্বত, হাওর, খাল, বিল, নদী-নালা, বন-বনাঞ্চল সর্বোপরি প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়ায় এখানকার অধিকাংশ মানুষের আচার-আচরনের মধ্যে উদারতা, আন্তরিকতা, দেশপ্রেম, ধৈর্য্য, পরোপকারিতা লক্ষ্য করা যায়। সর্বক্ষেত্রেই বিশ্বনাথের আর্থ সামাজিক অবস্থা দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক ভাল। এ জনপদের ৯৫ ভাগ মুসলমান লোকের সাথে বাকি ৫ ভাগ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন বহুকাল ধরে এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে এ জনপদের নাম উজ্জ্বল করেছেন। বিশ্বনাথের মানুষ যুগ যুগ ধরে একান্নবর্তী পরিবার প্রথা টিকিয়ে রেখেছেন আজও্। বিশ্বনাথের প্রায় প্রতিটি গ্রামের অসংখ্য পরিবারের মধ্যে দেখা যায় বাবা চাচারা এমনকি দাদা এবং দাদার ভাইয়েরাসহ প্রায় দেড় শতাধিক সদস্য নিয়ে একটি বাড়িতে একই সংসারে আছেন। অতিথি পরায়নতার জন্য বিশ্বনাথের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও শোনা যায়। বিভিন্ন দাবী-দাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে এই জনপদের মানুষ ততটা সচেতন না হলেও ভোটের ক্ষেত্রে সব সময়ই সচেতনতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট এই জনপদের মানুষ। এখানকার অনেক রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির কখনো ব্যক্তি উদ্যোগে, কখনো যৌথ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন। সেই আদিকাল থেকে এ পর্যন্ত নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে এই এলাকার রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। এই জনপদ যুগ যুগ ধরে অনেক মনীষী, পীর-দরবেশ, ওলি-আউলিয়ার পদচারণায় মুখরিত ছিল। বিশ্বনাথের মাটিতে ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল (র:) এর ৩৬০ আউলিয়ার মধ্যে হযরত শাহ চান্দ, শাহ কালু এবং শাহ কবির সহ অনেক সূফী সাধক, পীর-দরবেশ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। পাশাপাশি এই জনপদে আগমন ঘটেছে-দেশ-বিদেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তির। এছাড়া এই জনপদে জন্ম নিয়েছেন অনেক জ্ঞানী-গুনী, কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব যাদের আবির্ভাবে বিশ্বনাথ বাসী গর্বিত এবং ধন্য। তাদের অমর কীর্তি আজ স্থানীয়, জেলা, জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জল অধ্যায়।

(খ) রাজনৈতিক পরিচিতিঃ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল থাকায় স্বাভাবিক কারণে তারা অনেকটা সুখী আর এ কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ এলাকার রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ শান্ত ছিল গত দুই দশক পূর্বে আর এর পর জাতীয় ও সিলেটের রাজনীতিতে বিশ্বনাথে রাজনীতিবিদরা নিজ যোগ্যতার বলেই প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হওয়ায় দেশের মানচিত্রে বিশ্বনাথ একটি আলাদা পরিচিতি পায় । গত দুই দশক বিশ্বনাথের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা অশান্ত ছিল। যার কারনে রাজনীতির উত্তপ্ত মাঠে বিশ্বনাথের সম্ভাবনাময় ৮টি তাজা প্রাণ অনেকটা অকালে ঝরে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদরে মতে স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিধিদের মধ্যে তিব্র বিরোধের কারনে বিশ্বনাথে কাংঙ্খিত উন্নয়ন বাধাগস্ত হচ্ছে।

(গ) অর্থনৈতিক পরিচিতিঃ বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার তুলনায় বিশ্বনাথের মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা অনেক বেশি। প্রায় প্রতিটি ঘরেই দু-একজনের অধিক সদস্য প্রবাসী। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রে অধিক বেতনে চাকরি এবং সেখানে বিশ্বনাথীরা নিজস্ব ব্যবসা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করায় এখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভাল। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এখানে বানিজ্যিক ভাবে বাসা-বাড়ি, মার্কেট, দোকান নির্মাণ করলেও স্থানীয় ভাবে শিল্প কারখানা স্থাপিত না হওয়ায় অর্থনীতির মজবুদ ভিত্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি।

(ঘ) সাংস্কৃতিক পরিচিতিঃ অত্র জনপদের প্রত্যেক মানুষেরই বিচিত্র রকম সাংস্কৃতিক শখ আছে। কেউ কেউ রক্ষণশীল হওয়ায় কোন সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা যেমন নেই অন্যদিকে এখানে সাংস্কৃতিক চর্চায় সে রকম অংশ গ্রহণ বা ব্যবস্থা গড়ে না উঠলেও এখানকার অনেকেরই মরমী ভাব ধারায় গান-বাজনা শুনার, যাত্রা দেখার পাশাপাশি অন্যান্য বিনোদনের প্রতি প্রচন্ড ঝোঁক রয়েছে। এখানকার লোকজন হিন্দু-মুসলিম বিয়েতে, জন্মদিনে ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে বেশ জাঁকজমক ভাবে করে থাকেন।

(ঙ) ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক আচার ব্যবহারঃ বিশ্বনাথ যেহেতু সিলেটেরই একটি অংশ তাই সিলেটের ন্যায় এখানকার মুসলিম ও হিন্দুরা ধর্মীয় অনুশাসন, আচার-আচরণ বেশ আনুষ্টানিকতা সহকারে পালন করে থাকেন। এখানকার লোকজনের মধ্যে মাজার ও আখড়া প্রীতি রয়েছে। এছাড়া পীর-দরবেশ, আলেম-উলামা, সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি প্রচুর ভক্তি, তাদের আদেশ-নিষেধ পালন করার প্রবণতা আছে।

(চ) ঘর-বাড়ী পরিচিতিঃ বিশ্বনাথ উপজেলার অধিবাসীগণ প্রাচীন কাল থেকেই তাদের আবাস গৃহ নির্মাণ করতেন প্রাকৃতিক পরিবেশে এবং বংশানুক্রমে বসবাস করেন সেখানে। বাড়ীর পাশে থাকে বাঁশ ঝাড়, আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারী, নারিকেল, কলা, নানা রকমের ফুলসহ পর্যাপ্ত গাছ। বাড়ীর সঙ্গে জমিতে চাষ হয় বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন রকম শাক-সবজি। এখানকার অধিকাংশ ঘরবাড়ী পাঁকা দালানের তৈরী। গ্রামীন সবুজ শ্যামলীমায় আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন বিশাল অট্রালিকা দেশে মনে হয় না এটা গ্রাম না শহর। এছাড়া এখানে আঁধা পাকা দালান, টিনশেড ও ছনের ঘর রয়েছে।

(ছ) পোশাক পরিচ্ছদঃ প্রাচীন কাল থেকে এখানকার নারীরা পরিধান করতেন শাড়ীর সাথে ব্লাউজ, ছায়া এবং মেয়েরা কামিজ, সালোয়ার। পুরুষরা লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, প্যান্ট, শার্ট ও ছোট ছোট কিশোর ও যুবকরা হাফপ্যান্ট, ফুল প্যান্ট, শার্ট, পায়জামা, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি পরিধান করে থাকেন।

অন্যান্য সংবাদ