বিশ্বনাথ উপজেলায় প্রচলিত বিভিন্ন সংস্কার সমূহ

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৩, ২০১৬ ৮:২৫ অপরাহ্ন

আকিকা: বিশ্বনাথ তথা সিলেটাঞ্চলে সন্তান জন্মগ্রহণের পর গরু বা ছাগল জবাই করে তার মাংস আত্মীয় স্বজন ও গ্রামের পঞ্চায়েতী ঘরে বন্টন করে দেয়া হয়। কেহ কেহ বাবুর্চী এনে আত্মীয় স্বজন, পাড়া, মহল্লা গ্রামবাসীদের দাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠান করেন। এটাকেই আকীকা বলে। এটা সাধারণত: সন্তান জন্ম নেওয়ার ১৮ মাসের মধ্যে পালন করতে দেখা যায়। আগত অতিথিরা নবজাতকের জন্য পোষাক পরিচ্ছদ টাকা পয়সা সহ নানা ধরনের উপটোকন আনতে বা প্রদান করতে দেখা যায়। ইসলাম ধর্মেও আকীকার গুরুত্ব আছে।

ঘর হাচার: নতুন ঘর তৈরী করে বসবাস করার পূর্বে কোরআনে খতম ও মিলাদ ঐ ঘরেই পড়ানো হয় এবং সেখানে আত্মীয়, স্বজন, গ্রামবাসী, বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ী ও মসজিদের ইমাম সাহেব ও মুয়াজ্জিন সাহেবকে ভোজন করানো  হয় সামর্থ মতো। ভোজন পর্ব শেষে ইমাম সাব, মুয়াজ্জিন সাব ও হাফিজ সাহেবকে হাদিয়া স্বরূপ কিছু টাকা দেয়া হয়। এটাকেই সাধারণত: ঘর হাচার বলে।

ঘর বান্দনী: প্রায় এলাকায় জীন ভূতে মানুষের ক্ষয় ক্ষতি করতে শুনা যায়। বিশেষ করে মহিলাদেরকে জীন-ভূতের কবলে পড়তে শুনা যায় বেশী। কেহ বা মানসিক অশান্তিকে ও অজ্ঞতা বশত: জীন-ভূতের আছর মনে করেন। কিছু কিছু ভন্ড প্রতারক কবিরাজ টাকার লোভে গ্রামের নিরীহ বিশেষ করে অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত লোককে জীনের আছর লেগেছে বলে ভয় দেখিয়ে মানসিক ভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। এধরনের দুশ্চিন্তাগ্রস্থ লোক

সাধারণ: বিভিন্ন ধরনের দু:স্বপ্ন দেখতে পারে। এজন্য কবিরাজ বা মাওলানা সাহেবদের মাধ্যমে ঘরের চতুর্দিকে তাবিজ লোহা পড়া ইত্যাদি মাটির নিচে পোতা হয়। দরজায় তাবিজ লাগানো ও ঘরে আজান দেওয়া হয়্ তবে বর্তমানে শিক্ষা দীক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতিতে তা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

ছেগো মেগো দেওয়া: চৈত্র মাসে বৃষ্টি না হলে গ্রামের যুবকেরা মিলে রাত্রে একটি কুলা নিয়ে প্রত্যেকের বাড়ীর উঠানে গিয়ে সমস্বরে গান গায়। বাড়ির গৃহস্থ তাদের উপর এক বালতি পানি ছুড়ে মারেন। তখন সবাই, আরও বেশি লাফালাফি করে। তাদেরকে সামর্থমতো চাল ও লবন দিতে হয়। পরে তারা চাল ও লবন দিয়ে শিরনী করে খায়।

পান চিনি: পাত্র পছন্দ হলে বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্য বর পক্ষের লোকেরা মিষ্টি মিটাই দুধ পান ইত্যাদি নিয়ে কনের বাড়িতে যান। সেখানে উভয়পক্ষের স্বজনদের আলাপ সালাপ সহ ভুড়িভোজ হয়। মিষ্টি মিটাই পাড়া পড়শীদের বাড়িতেও বিতরণ করা হয়। এ অনুষ্ঠানকেই সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলে দুধপান বা পানি চিনি । তবে ইদানিং বর কনেকে নিয়ে একসাথে বিশাল কেক কেটে জাঁক জমক অনুষ্টানের মাধ্যমে পান চিনির অনুষ্টান করতেও দেখা যায়।

গায়ে হলুদ: আনুষ্ঠানিক ভাবে কাবিন নামা করার আগে অথবা বিয়ের পূর্ব রাতে/দিনে বর-বধুকে হলুদ মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল করানোর রীতিকে গায়ে হলুদ বলে। তবে গত এক দশক ধরে এদেশে গায়ে হলুদ অনুষ্টানে অনেক বৈচিত্র এসেছে গায়ে হলুদ অনুষ্টানে সুবিশাল পেন্ডেলের মধ্যে দৃষ্টি নন্দন ষ্টেইজ,গেইট,কার্পেট ও আরো নানান সাজ সজ্জা থাকে।

বাজার খানি : বাসর রাতের দিন নব বধূর হাত দিয়ে বাজার থেকে ক্রয় করা মাছ কাটানো হয় এবং রান্না করে তরকারী ও ভাত সবাইকে পরিবেশন করা হয় এই প্রথাকে বাজার খানি বলে।

আড়াইয়্যা: বিয়ের দু’এক দিন পর নববধুসহ বরের শ্বশুড় বাড়ি গমনকে আড়াইয়্যা বলে। এই আড়াইয়্যাতে বরকে আড়াই দিন শ্বশুরালয়ে অবস্থান করতে হয়।

লয় বাটা: নব বধুকে বিয়ের পরের দিন শ্বশুর বাড়ির কাকে কি সম্বোধন করে ডাকতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়ার পরিচিতি মুলক অনুষ্ঠানকে লয় বাটা বলে।

ইফতারি দেওয়া: রমজান মাসে মেয়ের বাড়িতে মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার নিয়ে যাওয়ার প্রথাকে ইফতারি দেওয়া বলে।

ফসল কাটার হান্দেশ: অগ্রহায়ন মাসে নতুন ধান কেটে সেই ধানের চাল দিয়ে সন্দেশ পিঠা তৈরি করে মেয়ের স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রথাকে ফসল কাটার সন্দেশ বলে।

বুলাবুলি: কার্তিক মাসের শেষ দিন বিকাল বেলা পাড়া প্রতিবেশীরা এক অন্যের গা ছুয়ে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নিজের বা পাড়ার ভাবীর সামনে হাজির হয়ে কলার পাছল দিয়ে ছুয়ে ছন্দাকারে ছড়া কাটতে থাকে এই ছাড় কাটাকে বুলাবুলি বলে। এইদিন গরু বাছুরের লেজ কেটে সেগুলোকে ভালভাবে গোসল করিয়ে দেওয়া হয়।

আশ্বিনের ভাতি কার্তিকে খাওয়া: আশ্বিন মাসের শেষদিন ভাত রেধে ঐ ভাত কার্তিক মাসের পয়েলা তারিখ সকালে খাওয়ার প্রথাকে আশ্বিনের ভাত কার্তিকে খাওয়া বলা হয়।

চল্লিশা: কারো মা বাপ মারা যাওয়ার সাধারণত ৪০ দিন পর বড় আকারে যে ভোজের আয়োজন করে গরিব মিসকিন এবং পাড়া প্রতিবেশীকে খাওয়ানো হয় তা চল্লিশা নামে পরিচিত।

ফুল শিন্নি: ছোট বড় কেউ মারা গেলে চার দিনের পর খৈ ও ফল ফলাদি দিয়ে যে শিরনী করা হয় তা ফুল শিন্নি নামে পরিচিত।
সালামি: নববধু, বর কিংবা ছোট কেউ যদি বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে সালাম করে তা হলে সালাম প্রাপক ব্যক্তি সালাম প্রদানকারীকে কিছু ইনাম দিতে হয়। এই ইনামই হচ্ছে সালামি বা সেলামি।

ঈদ সালাম: ঈদের পর বরকে বাধ্যতামুলক শ্বশুর বাড়ি বধু সহ যেতে হয় এই বাধ্যতামুলক শ্বশুরালয়ে গমনকে ঈদ সালাম বলে।

বিয়ের গীত: বিয়ের দিনে পাড়া প্রতিবেশী মিলে বর বা বধুকে কেন্দ্র করে যে গান গায় তাই বিয়ের গীত বা গান নামে পরিচিত।

ধামাইল: প্রাপ্ত বয়স্ক ও সমবয়সী মেয়েরা হাততালি দিয়ে একই সাথে ছন্দে ছন্দে পা ফেলে যে গান গায় তাকে ধামাইল বা ধামালি বলে।

উজার ঝাড়া: সাপে কামড়ালে গ্রাম্য হাতুড়ে কবিরাজের দ্বারা বাজনা সহ বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কল্পকাহিনী সুর ধরে তালেতালে গাওয়া হয়। বিশ্বনাথের আঞ্চলিক ভাষায় উক্ত গীতকে ঝাড়া বলে। আর যারা ঝাড়ে তাদেরকে ওঝা বা উজা বলে। ইদানিং কালে বাত রসের প্রবণতা কমাতে ও দরিদ্র এবং অজ্ঞ জনসাধারণ দিয়ে ঝাড়ানোর আয়োজন করে।

বাওনা: কাল্পনিক বালামুছিবত দূর করার জন্য কাল্পনিক ও অদৃশ্য মুছিবত সৃষ্টিকারী উদ্দেশ্যে যে উপটৌকন দেওয়া হয় তাকে বাওনা বলে। সাধারণত তিন রাস্তার মুখ, নদীর তীর এবং বিশাল কোণ প্রান্তরে  এই বাওনা দেওয়া হয়।

জারি পিটা: ইমাম হোসেনের শোকে মহররম মাসের ১০ তারিখে সুর করে ইমাম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করাকে জারিপিটা বলে।
ওয়ালিমা: বিয়ের ১/২ দিন পর কনে পক্ষে ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রন করে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তাকে ওয়ালিমা বলে। এ অনুষ্ঠানে অনেকেই সাধ্যমত উপহার সামগ্রী নিয়ে আসেন।

অন্যান্য সংবাদ